১৯৭৬ সালের ১১ আগষ্ট চট্টগ্রামের অধুনালুপ্ত দৈনিক স্বাধীনতার কক্সবাজার মহকুমা প্রতিনিধি হিসাবে সাংবাদিকতা পেশায় যোগদানের পর ১৯৭৭ সালের ১১ আগষ্ট পদোন্নতি পেয়ে পত্রিকাটির চট্টগ্রাম অফিসে জুনিয়র রিপোর্টার হিসাবে যোগদান ও ১৯৮০ সালের জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন এবং ১৯৮০ সালের আগষ্ট থেকে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামের সান্ধ্য দৈনিক পূর্বতারায় সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮২ সালে ঢাকার দৈনিক বাংলার বাণীর রিপোর্টার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারী থেকে ১৯৮৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দৈনিক নয়াবাংলায় সিনিয়র রিপোর্টার এবং একই বছরের ১লা এপ্রিল থেকে ১৩ বছর একটানা দৈনিক পূর্বকোণের সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১লা মার্চ থেকে দৈনিক সংবাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ও জাতীয় সংবাদ সংস্থা ইউএনবির চট্টগ্রাম প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেন এবং ২০০৮ সালের ৩১ শে মার্চ দৈনিক সংবাদের ব্যুরো প্রধান পদ থেকে অব্যাহতি নেন। ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই তিনি ইউএনবি থেকেও পদত্যাগ করেন।
জীবনবৃত্তান্ত ও কর্মজীবন
অঞ্জন কুমার সেন ১৯৭৬ সালের ১১ই আগষ্ট সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। ১৯৫৭ সালের ২৬শে ডিসেম্বর পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণকারী শ্রী সেন শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ধলঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি’তে (বিজ্ঞান) দ্বিতীয় বিভাগে, কক্সবাজার কলেজ (বর্তমানে সরকারী) থেকে এইচ.এস.সি’তে দ্বিতীয় বিভাগে এবং ১৯৮১ সালে তিনি চট্টগ্রামের সিটি কলেজ থেকে বি.এস.সি’তে ২য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তৎপরবর্তীতে চট্টগ্রাম আইন কলেজে ভর্তি হলেও পেশাগত ও আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর আর পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ছাত্র থাকাকালে স্কুলেই প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে সাংবাদিকতা পেশায় যোগদানের পর তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারসহ’৭১ এর ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠিত হলে একজন সদস্য হিসাবে তিনি এই পরিষদের সাংগঠনিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। সত্তরের দশকের শেষভাগে কর্ণেল নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে’৭১ এর ঘাতক দালালদের বিচারের দাবীতে গণআন্দোলন শুরু হলে একজন সচেতন পেশাজীবি হিসাবে তিনি সেই আন্দোলনে যুক্ত হন। নব্বই এর দশকের শুরুতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে’৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হলে এই সংগঠনের চট্টগ্রাম জেলা স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য হন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় থেকে ৫১টি পেশাজীবি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত চট্টগ্রাম সম্মিলিত পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ (পরে চট্টগ্রাম সম্মিলিত পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ) এর প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদ সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম সংযোজন করে অপর তিন ধর্মের নাগরিকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিনত করলে এর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু জনগোষ্টীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে গঠিত বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের কার্যক্রমের সাথে তিনি যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারী চট্টগ্রামে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন ৮ দলীয় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের চট্টগ্রাম আগমনকে কেন্দ্র করে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষন ও হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম সম্মিলিত পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের গঠিত গণতদন্ত কমিশনের একজন সদস্য হিসাবে সেদিনের নারকীয় ঘটনার আদ্যোপান্ত জাতির সামনে তুলে ধরতে কাজ করেন এবং চট্টগ্রামের আদালতে শেখ হাসিনার হত্যা প্রচেষ্টা মামলা শুরু হলে প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক হিসাবে তিনি আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামে বিজয় মেলা পরিষদ গঠিত হলে তিনি সেই পরিষদের প্রথম প্রচার সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর স্বৈরাচার, রাজাকার ও মৌলবাদমুক্ত জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ৯১ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে বৃহত্তর চট্টগ্রামে “গণতন্ত্রের অভিযাত্রা” সাংস্কৃতিক কর্মসূচির তিনি একজন সংগঠক ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) দুই মেয়াদে সভাপতি, পাঁচ মেয়াদে সাধারন সম্পাদক, তিন মেয়াদে যুগ্ম সম্পাদক, দুই মেয়াদে সাংগঠনিক সম্পাদক ও এক মেয়াদে প্রচার সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং কো-অপারেটিভ সোসাইটির এক মেয়াদে সভাপতি, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও দুই মেয়াদে পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেয়াদকালে শেরশাহ সাংবাদিক আবাসন এলাকায় ফ্ল্যাট ব্লকের অনুমোদন, এবং কল্পলোক সাংবাদিক প্রকল্পের জমি বরাদ্দের অনুমোদন পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সংবিধান প্রণয়ন কমিটিরও তিনি একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী প্রবর্ত্তক সংঘ ও প্রীতিলতা ট্রাষ্টের আজীবন সদস্য এবং চট্টগ্রাম সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন ও হকার্স বহুমূখী সমবায় সমিতির উপদেষ্টা। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে সাংবাদিকদের ন্যায্য মজুরী আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহনের কারনে সংবাদপত্রের একজন সম্পাদক কর্তৃক তিনি শারীরিকভাবে নিগৃহীত হলে এর প্রতিবাদে ও বিচার দাবীতে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) ডাকে দেশব্যাপী সংবাদপত্রে একদিনের ধর্মঘট পালিত হয় এবং চট্টগ্রামের সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষসমূহ প্রথম বেতন বোর্ড রোয়েদাদ অনুযায়ী সাংবাদিকদের বেতন ভাতা প্রদান ও সাংবাদিক নিগ্রহের জন্য উক্ত সংবাদপত্র সম্পাদক কর্তৃক ক্ষমা প্রার্থনা করে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে পুনরায় সংবাদপত্রের প্রকাশনা শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে দেশের ১১টি সংবাদপত্রের মালিক কর্তৃপক্ষ সংবাদপত্র কর্মচারী বেতন বোর্ড রোয়েদাদের বৈধতা চ্যানেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে (মহামান্য হাইকোর্টে) রিট মামলা দায়ের করলে সাংবাদিকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে শ্রী অঞ্জন সেন উক্ত মামলায় বিএফইউজের প্রতিনিধি হিসাবে পক্ষভুক্ত হয়ে আইনগত লড়াই চালিয়ে যান এবং ২০০৫ সালে উক্ত রীট মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে মাননীয় আদালত ৪র্থ ও ৫ম বেতন বোর্ড রোয়েদাদ বৈধ ঘোষনা করে তদারকির জন্য “রোয়েদাদ মানিটরিং সেল” গঠন সহ সরকারকে ৭ দফা নির্দেশনা দেয়। উক্ত রায়ের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে মনিটরিং সেল গঠিত হয় এবং ৭ম ও ৮ম বেতন বোর্ড রোয়েদাদ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হয়。
সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ১৯৯৮ সালের স্বাধীনতা দিবসে “স্বাধীনতা সম্মাননা পদক” প্রদান করে। সাংবাদিকতায় কৃতিত্বের জন্য চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব তাঁকে “কৃতি সাংবাদিক’’ সংবর্ধনা প্রদান করে। ইউএনবিতে কর্মরত থাকাকালে তিনি ২০০০ সালের বেষ্ট রিপোর্টার নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ প্রেস ইনষ্টিটিউটের একমাসব্যাপি বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ, একমাসব্যাপী ইনহাউজ প্রশিক্ষণ, থমসন ফাউন্ডেশনের একমাসব্যাপী সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ, কমনওয়েলথ জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশনের তিন মাসব্যাপি বেসিক জার্নালিজম প্রোগ্রাম এবং লন্ডনের ফাইনান্সিয়িাল টাইমস আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী ফাইনান্সিয়িাল রিপোর্টিং ফেলোশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন。
সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য তিনি চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা ও ভারত সফর করেন। তাঁর স্ত্রী স্বাতী সেন কুসুমকুমারী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা এবং পুত্র অনিন্দ্য সেন বুয়েট থেকে ইন্ডাষ্ট্রীয়াল এন্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উর্ত্তীণ হয়ে এখন একটি বেসরকারী শিল্পগোষ্ঠীতে প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত ও কন্যা অদ্রি সেন চট্টগ্রাম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত。
পেশাগত সারসংক্ষেপ ও অবদান
অঞ্জন কুমার সেন বর্তমানে কোলকাতার একটি দৈনিক পত্রিকার চট্টগ্রাম প্রতিনিধি হিসাবে কর্মরত রয়েছেন।